আল জামি'আতুল আরাবিয়া দারুল হিদায়াহ
বরাবর
ফাতওয়া বিভাগ
আল জামি'আতুল আরাবিয়া দারুল হিদায়াহ, পোরশা ইসলামপুর, পোরশা, নওগাঁ, বাংলাদেশ।
বিষয়: ওসিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মনের নিয়ত ও সংশয় সংক্রান্ত ঘটনার বিবরণ
প্রশ্নের বিবরণ:
বরাবর, শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ওসিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মনের নিয়ত ও সংশয় সংক্রান্ত ঘটনার বিবরণ ঘটনা ১: কিনায়া বাক্যের ক্ষেত্রে ওসিডি (OCD) আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা একবার জায়েদ তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলল, "বের হবো"। এর মাধ্যমে সে আসলেই বোঝাতে চেয়েছিল যে জায়েদ নিজে ঘর থেকে বের হবে, অর্থাৎ স্ত্রীর বাবার বাড়ি থেকে জায়েদের বাড়িতে আসবে। সে সময়কার বাহ্যিক পরিস্থিতি দেখে কারো পক্ষেই বোঝার উপায় ছিল না যে তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া চলছে; চারপাশের পরিবেশ একেবারেই স্বাভাবিক ছিল এবং তারা নিজেরাও তখন কোনো ঝগড়া করছিল না। তবে জায়েদ ওসিডি (OCD) নামক মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এর ফলে তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়, অনেকটা জোরপূর্বকভাবেই মনের ভেতর বিভিন্ন নিয়ত বা সংকল্প তৈরি হয়ে যায়। "বের হবো" কথাটি বলার সময়ও তার মনে এ ধরনের নিয়ত ইচ্ছায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল এবং মনে মনে সে বলছিল; পাশাপাশি মানসিকভাবে সে কিছুটা রেগেও ছিল। জায়েদ সবসময়ই এই ওসিডি-তে ভোগে। বিশেষ করে যেসব বিষয় সাধারণত খুবই স্পর্শকাতর বা ভয়ংকর, ঠিক সেসব ক্ষেত্রে তার এই ওসিডির মাত্রা আরও চরম আকার ধারণ করে। ঘটনা ২: অতীত নিয়ে আলোচনা ও "স্বাধীন হও" সংক্রান্ত ঘটনা জায়েদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অতীত নিয়ে কথা বলা— অতীতের কারণে কোনো কিছু হয়ে গেল কি না। কারণ যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে তো আল্লাহর হুকুমে আর একসাথে থাকা যাবে না। মূলত এই কারণেই সে কথাগুলো স্ত্রীকে বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার মন সায় দিচ্ছিল না বা বলতে দিচ্ছিল না। তাই সে জোর করেই নিজের মনকে বলল যে, সে নিয়ত করেই কথাগুলো বলবে। এরপর জায়েদ হয়তো কথা বলা থামিয়ে দিয়েছিল, তবে মাঝখানে এই থেমে যাওয়ার ব্যাপারে সে নিজেই দ্বিধান্বিত। কিন্তু পরবর্তীতে কথা বলার সময় সে একটি কিনায়া বাক্য বলে ফেলে। বাক্যটি বলার পেছনে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল স্ত্রীকে মানসিকভাবে বোঝানো। সে বলেছিল, "তুমি স্বাধীন (Independent) হও।" এই কথার মাধ্যমে সে মূলত স্ত্রীকে কোনো একটি দক্ষতা বা কাজ শিখতে বলেছিল এবং সে আসলেই এই ধরনের কথাগুলোই বলছিল। জায়েদের স্পষ্ট মনে আছে, এই কিনায়া বাক্যটি বলার সময় তার মনে বিচ্ছেদের কোনো নিয়ত ছিল না। কিন্তু এখন সে ভয় পাচ্ছে— আগে মনে মনে জোর করে যে নিয়তটি সে করেছিল, তা কি এই কথার সাথে যুক্ত হয়ে গেল কি না! জায়েদ মূলত পরের কথাগুলো নিয়ত করে বলতে চেয়েছিল। সে বোঝাতে চেয়েছিল যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ যদি আগে মারা যায়, তাহলে স্ত্রী যেন কারো কাছে হাত না পাতে এবং নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিতে পারে। অর্থাৎ, সে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার কথা বুঝিয়েছিল। কারণ জায়েদ জানত যে, ভবিষ্যতের কথাবার্তায় নিয়ত করলে কোনো সমস্যা হয় না। সে সময় তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়ার পরিবেশ ছিল না। নোট: জায়েদের এই সব কথা বলার মূল প্রেক্ষাপটই ছিল এটি যে— অতীতের কোনো কারণে তাদের বিয়েতে কোনো সমস্যা হয়ে গেল কি না। কারণ যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর হুকুমে আর একসাথে থাকা যাবে না। এই উদ্বেগের বশবর্তী হয়েই সে এতসব কথা বলেছিল এবং এর মাঝেই বলা ওই কিনায়া বাক্যটি নিয়ে এখন সে চরম সন্দেহে পড়ে গিয়েছে। ঘটনা ৩: মনের সন্দেহ মনে রাখার জন্য কাগজে লিখে রাখা একদিন জায়েদ খুব সন্দেহে পড়েছিল যে সে মনে মনে আসলে কী বলেছে। সেটা মনে রাখার জন্য, হয়তো সে এই স্পষ্ট শব্দগুলোই বলছিল ভেবে এবং তার তীব্র সন্দেহ হচ্ছিল যে, ওই কিনায়া বাক্যটি বলার সময় হয়তো সে মনে মনে নির্দিষ্ট এই স্পষ্ট শব্দগুলোই বলে ফেলেছিল—এই কারণে সে ওই স্পষ্ট শব্দগুলো একটি কাগজে লিখে রাখে। এটা করার উদ্দেশ্য ছিল যেন পরবর্তীতে সে পুরো ঘটনাটি মিলিয়ে দেখতে পারে বা বিশ্লেষণ করতে পারে যে, ঘটনা আসলে কোন দিকে গেল। সে তখন জানত যে শুধু মনে মনে কিছু ভাবলে বা বললে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু সে আসলেই ওই কিনায়া বাক্যটি বলার সময় মনে মনে কী ভেবেছিল বা কী বলেছিল—তা সে নিজেই নিশ্চিত করে জানত না। শুধুমাত্র নিজের ওই বিভ্রান্তি মনে রাখার জন্য এবং পরে হিসাব মেলানোর জন্য সে একটি কাগজের এক লাইনের শুরুতে সেই স্পষ্ট শব্দগুলো লিখে রাখে। অনেকদিন পর সেই কাগজটি হঠাৎ চোখে পড়ায় জায়েদ এখন ভীষণ দুশ্চিন্তায় (tension) পড়ে গেছে যে, এর ফলে বাস্তবেই কোনো ক্ষতি হয়ে গেল কি না। ঘটনা ৪: ফতোয়া কপি-পেস্ট ও অনুবাদের সময় মনের নিয়ত ও সংশয় সংক্রান্ত ঘটনা ১. মূল উদ্দেশ্য ও প্রারম্ভিক অবস্থা: ব্যক্তিটি প্রথমে লেখাটি দেখতে চাননি এবং ভয়ও পাচ্ছিলেন, কিন্তু পরে কৌতূহলবশত কেবল তথ্য জানার জন্য সেটি কপি করেন। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এআই (AI) দিয়ে অনুবাদ করে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা। উল্লেখ্য যে, ব্যক্তিটি কখনোই এই লেখাটি অন্য কোথাও বা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্যে কপি করেননি। ২. কপি করা অংশ ও লিংক: উত্তরের অংশের কথাটুকু এই লিংক থেকে নেওয়া: [https://www.banuri.edu.pk/readquestion/طلا-ق-کا-وسوسہ/25-08-2018] ৩. কপি করার সময়কার মানসিক অবস্থা: লেখাটি কপি করার সময় তাঁর মনে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত ছিল কি না, তা নিয়ে তিনি যথেষ্ট বিভ্রান্ত বা সংশয়াচ্ছন্ন। ৪. পেস্ট করার সময়কার সিদ্ধান্ত: পেস্ট করার সময় তিনি মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। তবে তিনি মনের খেয়ালের ইচ্ছায় নিয়ত করেছেন। এর পেছনে মূল কারণ ছিল তাঁর এই বিশ্বাস যে—এটি অন্যের কথা (হিকায়াত), তাই এতে কোনো ক্ষতি হবে না। পেস্ট করার পর শেষে তিনি 'বাংলা' কথাটি লিখেছিলেন। ৫. নির্দিষ্ট শব্দের প্রয়োগ ও অভ্যন্তরীণ যুক্তি: তাঁর মনে এমন খেয়াল এসেছিল যে— "লেখার এই স্পষ্ট শব্দগুলোই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কার্যকর হোক।" তবে এই খেয়ালের পাশাপাশি তাঁর মনে এই প্রবল বিশ্বাস ছিল যে—বাস্তবিক কাজ ছাড়া (যেমন—বলা বা লেখা) শুধু মনে মনে এমন ভাবলে তা প্রয়োগ হওয়া প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ, তিনি এই 'অসম্ভবতার' ওপর ভরসা করেই মনে মনে ওই খেয়ালটি করেছিলেন। ৬. নিয়ত বাতিলের বিষয়ে বিভ্রান্তি: পুরো প্রক্রিয়ার মাঝখানে তাঁর মনে হচ্ছিল যে তিনি মনে মনে ওই নিয়তকে দুইবার 'না' করেছেন (অর্থাৎ নিয়ত বাতিল করেছেন)। কিন্তু এই বিষয়টি তিনি আসলেই করেছিলেন কি না, তা নিয়ে তিনি বর্তমানে যথেষ্ট বিভ্রান্ত। ৭. অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল: অনুবাদ করার পর তিনি দেখেন যে সেখানে তাঁর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি মারাত্মক ও ভয়ংকর কথা লেখা আছে। তিনি ভেবেছিলেন বিষয়টি হয়তো একবারের জন্য (যখন করবে শুধু মাত্র তখন), কিন্তু লেখায় দেখা যায় সেটি বারবার ঘটার কথা বলা হয়েছে। এখন তাঁর প্রশ্ন—ভাষাগত কারণে ওই মারাত্মক কথাগুলোর অর্থ না জানার পরও কি তা ওই ব্যক্তির ওপর কার্যকর হয়ে যাবে? ৮. অনলাইন তথ্যের প্রভাব: ব্যক্তিটি অনলাইনে দেখেছেন যে, নিজের লেখা স্পষ্ট শব্দ যদি কেউ নিয়ত করে কপি-পেস্ট করে, তবে তা কার্যকর হয়ে যায়। এই তথ্যটি তাঁর মনের ভয় ও সংশয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। (লিংক: https://darulifta-deoband.com/home/ur/talaq-divorce/154779) ৯. হিকায়াত পাঠের নিয়ত ও ওসিডির প্রভাব: ব্যক্তিটি জানেন যে, কেউ যদি হিকায়াত পড়ার সময় নিয়ত করে ওই স্পষ্ট শব্দগুলো পড়ে, তবে তা কার্যকর হয়ে যায়। এখন তিনি নিজের কপি-পেস্ট করার বিষয়টিকে হিকায়াত পড়ার সাথে তুলনা করছেন। ১০. নিয়তের ধরন: এই ধরনের বিষয়গুলোতে ব্যক্তির মনে নিয়ত চলে আসেই—কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে, কখনো জোরপূর্বক আসা চিন্তা (Forced thoughts) আবার কখনো খুব স্বাভাবিকভাবে। ১১. নিজে লেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা: ব্যক্তিটি অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজে কখনো এমন স্পষ্ট শব্দ নিজ হাতে লেখেননি বা লেখেন না। ১২. লিংক কপি করার সময়ের নিয়ত: লিংক কপি করার সময়ও তাঁর মনে আচমকা নিয়ত চলে আসে। এখন তাঁর মনে প্রশ্ন—এক্ষেত্রেও কি কোনো কিছু হয়ে যাওয়ার ভয় আছে? ১৩. বর্তমান উদ্বেগ: এখন ব্যক্তিটি আতঙ্কিত যে—ওই মারাত্মক শব্দগুলোর অর্থ আগে না জেনে এবং "কিছুই হবে না" মনে করে তিনি যে মানসিক প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, তার ফলে ওই শব্দগুলো কি এখন তাঁর ওপর আসলেই কার্যকর হয়ে যাবে? ১৪. পারিবারিক চাপ ও মানসিক অসুস্থতা: বর্তমানে ব্যক্তিটি এই বিষয়গুলো নিয়ে ভেবে ভেবে মানসিকভাবে প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পরিবার থেকে নানাভাবে মানসিক চাপে বা প্রেশারে আছেন, যা তাঁর কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ১৫. পাকা-পোক্ত নিয়ত সংক্রান্ত সংশয়: ব্যক্তির মনে এখন এই প্রশ্নটিও আসছে যে, যদি সেই মুহূর্তে ব্যক্তির কোনো পাকা-পোক্ত বা সুনিশ্চিত নিয়ত থাকত, তবে তার বিধান কী হতো? আর উপরে বর্ণিত ব্যক্তির এই বিশেষ পরিস্থিতির (যেখানে তিনি ঘটনাটিকে অসম্ভব মনে করেছিলেন এবং মনের খেয়ালের নিয়ত করেছিলেন) বিধানই বা কী হবে? ১৬. শর্তযুক্ত নিয়ত ও এর বিধান: ব্যক্তিটি এখন জানতে চাচ্ছেন—তিনি মনে মনে যে কথাগুলো বলছেন বা ভাবছেন, সেগুলো কি 'শর্তযুক্ত নিয়ত' (Conditional Intent)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে নাকি সাধারণ নিয়ত? এবং যদি তা শর্তযুক্ত নিয়ত হয়ও, তবে কি শুধু মনে মনে (মুখে উচ্চারণ না করে) এমন নিয়ত করলেই তা কার্যকর বা বলবৎ হয়ে যায়?
সমাধান:
بسم الله الرحمن الرحيم، حامدا ومصليا ومسلما
অনলাইন ফাতওয়া || ফাতওয়া বিভাগ || আল জামি'আতুল আরাবিয়া দারুল হিদায়াহ